পাহাড়িঢলে ফসলহানীতে সর্বস্বান্ত জনগণ ও হাওড় অঞ্চলকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা কর।

H-1

প্রিয় হাওড় অঞ্চলবাসী,
গত এপ্রিল ২০১৭ এর প্রথম দিকে ভারতের আসাম ও মেঘালয়ের পাহাড়ি ঢলে বৃহত্তর সিলেটসহ ভাটি অঞ্চলের হাওরগুলো অকাল বন্যায় প্লাবিত আপনাদের দূর্ভোগের সৃষ্টি করেছে। প্রায় পুরো হাওড় অঞ্চলের অপরিপক্ক ধান তলিয়ে গেছে। সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণা জেলার ব্যাপক অঞ্চল প্লাবিত হয়ে এই ক্ষাতির পরিমাণকে বাড়িয়ে দিয়েছে। অকাল বন্যার হাত থেকে কাঁচা ধান রক্ষার জন্য হাওড় রক্ষাকারী বাঁধ রক্ষায় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েও তা রক্ষা করতে পারেন নি। তলিয়ে যাওয়া কিছু কিছু আধাপাঁকা ধান বুকপানি কোমরপানির নিচ থেকে কাটার প্রাণান্ত চেষ্টা করেও তা ঘরে তুলতে পারে না। অথচ বন্যার পূর্বে কৃষক ব্যাপক ফসলের সম্ভাবনার আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। কিন্তু আশা আকাঙ্খার মাঝে পাহাড়ি ঢল এসে কৃষকের সকল আনন্দকে ধূলিস্যাৎ করে দেয়। বছরে এক ফসলের উপর নির্ভরশীল হাওড়বাসী প্রায় প্রতি বছরই উৎপাদিত ফসল ধ্বংসের ঘটনায় হতাশায় নিমজ্জিত। ফসল ক্ষেতে অথৈ পানি দেখে কৃষকের আর্তনাদ, কান্না, আহাজারি সর্বোপরি দিশেহারা অবস্থা যে কোন বিবেকবান মানুষের প্রতিক্রিয়া না হয়ে পারে না। চলতি বছর দেশের অন্যান্য অংশের নিম্নাঞ্চলেও ফসলের ব্যপক ক্ষতি হয়েছে। তা ছাড়া ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাসমুহে ফসলের ব্যপক ক্ষতি হয়েছে। এর ফলে দেশ বড় ধরনের খাদ্য ঘাটতির সম্মুখীন হবে। আর ইতিমধ্যে এ সুযোগ গ্রহণ করছে একশ্রেণীর মজুদদার, মুনাফাখোর ব্যবসায়ী যার ফলে এখনই মোটা চাল ৫২টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে জোর আওয়াজ তুলুন-
১) পাহাড়িঢলে ফসলহানীতে সর্বস্বান্ত জনগণকে রক্ষা করতে হাওড় অঞ্চলকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা কর।
ক) বিপর্যস্ত জনগণকে রক্ষায় পর্যাপ্ত ত্রাণ, পুর্ণ রেশন এবং নগদ অর্থ প্রদান করতে হবে।
খ) চাল,ডাল, তেলসহ খাদ্যসামগ্রী বিনামূল্যে পর্যাপ্ত পরিমাণে দ্রুত সরবরাহ করতে হবে।
গ) ক্ষতিগ্রস্থ প্রত্যেক পরিবারকে মাসে মাথা প্রতি ১৫ কেজি চাল ৫০০০ টাকা নগদ প্রদান করতে হবে।
ঘ) দুর্গত এলাকায় বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদান করতে হবে।
ঙ) সরকার নির্ধারিত স্বল্প সংখ্যক(৩ লক্ষ ২৩ হাজার) পরিবার নয়, হাওড় অঞ্চলের সকল ক্ষতিগ্রস্থ (প্রায় ২০ লক্ষ) পরিবারকে সহায়তা দিতে হবে।
চ) পশুখাদ্য সরবরাহ করে গবাদি পশু রক্ষা করতে হবে।
২) দুর্গত এলাকায় সকল প্রকার ঋণ, শিক্ষার্থীদের বেতন ও ফি, বিদ্যুৎ বিল মওকুফ করতে হবে।
ক) কৃষি ঋণ, ব্যাংক ঋণ, এনজিও ঋণ, মহাজনী ঋণসহ সকল প্রকার ঋণ মওকুফ করতে হবে।
খ) দুর্গত এলাকার স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বেতন ও ফি মওকুফ করতে হবে।
গ) দুর্গত এলাকার কৃষক-জনগণের বিদ্যুৎ বিল মওকুফ করতে হবে।
৪) সকল জলমহালের ইজারা বাতিল করে কৃষক জেলেদের মাছ ধরার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
ক) টাঙ্গুয়া হাওড়ের মাছ, গাছ, পাখি সংরক্ষণের নামে বেপরোয়া লুটপাট ও দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। হাওড়পাড়ের গ্রামগুলোর কৃষক- জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করে মাছ ধরা বন্ধ করা যাবে না।
খ) হাওড়ে পানি দূষণে মাছ মড়কে ক্ষতি মোকাবেলায় পর্যাপ্ত পোণা মাছ অবমুক্ত করতে হবে।
৫) সরকারী ত্রাণসামগ্রী ও নগদ অর্থ প্রদানে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি প্রতিরোধ করতে হবে।
ক) সরকারের বিনামুল্যে চাল ও ১৫ টাকা কেজি দরে চাল বিতরণে দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে।
খ) ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ প্রকাশ করতে হবে। এ নিয়ে মিথ্যাচার, প্রতারণামূলক প্রচারণার মুখোষ উন্মেচন করতে এগিয়ে আসুন। তালিকা প্রণয়নে দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে।
৬) চাষের মৌসুমে বিনামুল্যে বীজ, সার, কীটনাশকসহ কৃষি উপকরণ সরবরাহ করতে
হবে।
৭) সকল খাল-বিল, নদ-নদী খনন করতে হবে।
ক) অকাল বন্যার কবল থেকে ফসল রক্ষার জন্য সুমেশ্বরী, কংশ, যাদুকাটা, বৌলাই, চলতি, রক্তি, ঘোড়াউত্রা কালনী, সুরমা, কুশিয়ারাসহ সকল উপনদী- নদী, শাখানদীগুলো খনন করতে হবে।
খ) বিলের তলদেশ, খাল ইত্যাদি খনন করতে হবে।
৮) যথাসময়ে হাওড়ে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করতে হবে।
ক) প্রতি বছর জানুয়ারি মাসের মধ্যে বাঁধ নির্মাণের কাজ শেষ করতে হবে।
খ) বেড়িবাঁধ নির্মাণে পানি উন্নয়ন বোর্ড, ঠিকাদার, পিআইসি’র লুটপাট ও দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে।
গ) বাঁধ নির্মাণে মাটিকাটার যন্ত্র (এসকোবেটর) ব্যবহার করে নির্মিত বাঁধ দুর্বল হয়, তাই, এই যন্ত্র দিয়ে বাঁধ নির্মাণ বন্ধ করতে হবে।
ঘ) বাঁধ নির্মাণে সংশ্লিষ্ট এলাকার কৃষকদের সম্পৃক্ত করতে হবে।
বাংলাদেশ ও তার নিকট প্রতিবেশি ভারতের সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের যে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে প্রকৃতির ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হয়েছে। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ আসামের বনাঞ্চলে মূল্যবান কাঠ লুটপাটের যে ধারা সৃষ্টি করেছিল তা আরো বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে কয়লা, চুনাপাথর উন্মুক্ত পদ্ধতিতে উত্তোলনসহ খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ যথেচ্ছ ব্যবহারে বনাঞ্চল উজাড় হয়ে গেছে। ফলে বর্ষাকালে পাহাড়ি ঢলে ব্যাপকভাবে ভূ-ত্বকের মাটি, বালি নেমে এসে নদ-নদী, উপনদী ও খালের তলদেশ ভরাট করে ফেলছে। বর্তমানে অধিকাংশ নদ-নদীর নাব্যতা নেই। আবার নগরায়নের ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের নামে অপরিকল্পিত রাজপথ, রেলপথ এবং নদী-খালে ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণের কারণে নদী ও পানি প্রবাহের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত ও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। নদী ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত পাহাড়ি ঢলের বিপুল জলরাশি হাওড় এলাকার পানির মাত্রা ও উচ্চতা বৃদ্ধি করছে। ফলে ভেসে যাচ্ছে কৃষকের শ্রমে-ঘামে উৎপাদিত ফসল। কোন কোন সময় পাহাড়ি নদী তার গতিপথ পরিবর্তন করে লোকালয়ে ও ফসলি জমি ধ্বংস করে নিজের চলার পথ সৃষ্টি করে। গত শতকের ৮০’র দশকে সৃষ্ট মারাম নদীর সমস্যা তার মধ্যে অন্যতম।
৬০-এর দশকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও অধিক ফসল ফলানোর কথা বলে তৎকালীন মার্কিন সাক্ষাজ্যবাদের পরিকল্পনায় ওয়াপদা গঠিত হয়। হাওড় অঞ্চলে অকাল বন্যার হাত থেকে ফসল রক্ষার নামে সুদূর পাকিস্তান আমল থেকে অপরিকল্পিত বেড়িবাঁধ দিয়ে আসছে। ফলে নদীর তলদেশ ভরাট, বিলের উচ্চতা বৃদ্ধি ইত্যাদি সমস্যা আরো বৃদ্ধি পেয়ে প্রকট আকার ধারণ করেছে। এ সমস্যার বৈজ্ঞানিক সমাধান না খুঁজে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার প্রজেক্ট বাস্তবায়নের নামে লুটপাটের মহোৎসব চলছে।
সাম্রাজ্যবাদ ও দালাল সরকারগুলো হাওর এলাকার প্রাকৃতিক নিয়মকে অগ্রাহ্য করে তাদের শোষণ-লুটপাট অব্যাহত রাখার স্বার্থে সমস্যা স্থায়ী সমাধান না করে তা জিইয়ে রাখে। ফলে প্রায় প্রতিবছরই পাহাড়ি ঢলে ফসলহানি ও জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এই সমস্যার মূল কারণ নদী ভরাট সমস্যার সমাধানে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ওয়াপদার পক্ষ থেকে প্রতি বছর হাওড়রক্ষা বাঁধ দেওয়া হয়। এতে শোষক শ্রেণির লুটপাটের ব্যবস্থা হলেও পাহাড়ি ঢলের কবল থেকে ফসল রক্ষা পায় নি। ওয়াপদার এই লুটপাটমূলক তৎপরতাকে বন্ধ করে অত্র অঞ্চলের নদীসমূহের গভীরতা ও নাব্যতা সৃষ্টির জন্য নদী খনন এর বিকল্প নেই। নদীর গভীরতা ও নাব্যতা বৃদ্ধি পেলে বর্ষার শেষে হাওড়ের পানি দ্রুত সরে যাওয়ার অবস্থা সৃষ্টি হবে। যাতে বীজ বপনে উৎপাদন এগিয়ে আসবে। নদীর খননকৃত মাটি দিয়ে নদীর পাড়/তীর বেঁধে দিয়ে পানির প্লাবন রোধ করার ব্যবস্থা করা। হাওড় এলাকার জনগণের জীবন-জীবিকার একমাত্র ফসল নির্বিঘ্নে ঘরে ওঠানোর নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। এর জন্য বোরো ধানকে গবেষণার মাধ্যমে উন্নত রূপ দিয়ে স্বল্প সময়ের মধ্যে ধান পরিপক্ক হওয়ার উপযোগী বীজ উদ্ভাবন করে এবং প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে সমস্যার সমাধান করতে হবে। সাম্রাজ্যবাদ-সামন্তবাদ ও আমলা-দালালপুঁজির স্বার্থরক্ষাকারি সৈরাচারী সরকার তা করবে না এই সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন কৃষক-জনগণ ঐক্যবদ্ধ করে কৃষি বিপ্লবের লক্ষ্যে শ্রমিক-কৃষক-জনগণের রাষ্ট্র, সরকার ও সংবিধানের দাবীতে কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলা। তাই আসুন, কৃষক সংগ্রাম সমিতির পতাকা তলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সৃষ্ট সমস্যার আশু সমাধান এবং সেই সাথে স্থায়ী সমাধানের জন্য সংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ হয়ে দুর্বার কৃষক আন্দোলন গড়ে তুলি।

সংগ্রামী অভিনন্দনসহ
কেন্দ্রীয় কমিটি
বাংলাদেশ কৃষক সংগ্রাম সমিতি

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *